জাবেদা কত প্রকার
জাবেদা কত প্রকার

জাবেদা কাকে বলে, কত প্রকার , জাবেদার শ্রেণীবিভাগ

সূচনা

জাবেদা হলো হিসাবের প্রাথমিক বই, সহকারী বই, দৈনিক বই। একটি প্রতিষ্ঠানের সকল লেনদেনকে সর্বপ্রথম জাবেদায় লিপিবদ্ধ করা হয় । এরপর জাবেদা থেকে খতিয়ানে স্থানান্তর করা । হিসাবের ক্ষেত্রে জাবেদা প্রস্তুত বাধ্যতামূলক নয় তবে নির্ভূল হিসাব সংরক্ষনের জন্য জাবেদা প্রস্তুত করা প্রয়োজন। আমরা আজ জাবেদা কি, কাকে বলে ,কত প্রকার তা জানবো । জাবেদার শ্রেণীবিভাগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলেচনা করবো।

জাবেদার ধারণা

জাবেদা শব্দের উৎপত্তি:

বাংলায় জাবেদা শব্দটি ইংরেজি “Journal” শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শব্দটি ফারসি “Jour” শব্দ থেকে এসেছে।  Jour শব্দের অর্থ হলো দিন বা দিবস বা দৈনিক। এর ফলে শাব্দিক অর্থ অনুসারে জাবেদাকে “দৈনিক বই ” বা ”  Day Book” বলা হয়।

জাবেদা কাকে বলে?

সাধারন অর্থে, প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত লেনদেনসমূহকে প্রাথমিকভাবে হিসাবের যে বইতে লিপিবদ্ধ করা হয় তাকে জাবেদা বলে।

ব্যাপক অর্থে, হিসাবের যে বইতে প্রতিষ্ঠানের লেনদেন সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথে দুতরফা দাখিলা পদ্ধতি অনুযায়ী ডেবিট ও ক্রেডিট নির্ণয় করে তারিখের ক্রমানুসারে ব্যাখ্যাসহ লিপিবদ্ধ করা হয় তাকে জাবেদা বলে।

Prof. R. J. Chamber-এর মতে , “Journal is a book containing a record of each day’s transaction”(জাবেদা হলো এমন একটি বই যাতে দৈনিক সংঘটিত লেনদেনগুলোকে লিখে সংরক্ষন করা হয়– অধ্যাপক চেম্বার)

জাবেদার অন্য সকল নামসমূহ কি কি?

জাবেদা বিভিন্ন নামে পরিচিত । যেমন:-

  1. প্রাথমিক বই (Primary Book): কারণ সর্বপ্রথম জাবেদা করা হয়।
  2. সহকারী বই ( Subsidary Book) : কারন খতিয়ান প্রস্তুতে সহায়তা করে , বাধ্যতামূলক নয়।
  3. দৈনিক বই (Day Book): কারণ প্রতিদিন তৈরী করা হয়।
  4. মৌলিক বই(Original Book): কারণ মৌলিক ডেবিট-ক্রেডিট হিসাব লিখা হয়।

দেখতে পারেন: জাবেদা দাখিলার সহজ নিয়ম , ৬টি শর্টকার্ট রুলস সকল ডেবিট-ক্রেডিট

জাবেদার শ্রেণীবিভাগ

জাবেদা কত প্রকার? কি কি?

জাবেদার নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণী বিভাগ নেই । প্রতিষ্ঠানের আকার ও লেনদেনে সংখ্যার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন জাবেদা করে থাকে । ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি জাবেদা বহিই যথেষ্ঠ । বৃহত আকার প্রতিষ্ঠানের আলোকে জাবেদাকে নিম্নক্ত শ্রেণীতে ভাগ করা যায়।

জাবেদা প্রধানত দুই প্রকার ।

ক. বিশেষ জাবেদা।

খ. প্রকৃত জাবেদা।

এছাড়াও এন্ট্রি বা দাখিলার ভিত্তিতে জাবেদাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।–

১. সরল জাবেদা।

২. জৌগিক বা মিশ্র জাবেদা।

প্রকৃত ও বিশেষ জাবেদাকে নিম্নক্ত শ্রেণীতে ভাগ করা যায়:-

ক.বিশেষ জাবেদা

১.ক্রয় জাবেদা(Purchase Journal)

২.বিক্রয় জাবেদা(Sales Journal)

৩.ক্রয় ফেরত জাবেদা(Purchase Return Journal)

৪.বিক্রয় ফেরত জাবেদা(Sales Return Journal)

৫.নগদ প্রদান জাবেদা(Cash Payment Journal)

৬. নগদ প্রাপ্তি জাবেদা(Cash Receipts Journal)

৭.নগদান বই(Cash Book)

খ.প্রকৃত জাবেদা

১.সাধারণ জাবেদা(General Journal)

২.সমন্বয় জাবেদা(Adjusting Journal)

৩.সমাপনী জাবেদা(Closing Journal)

৪.প্রারম্ভিক জাবেদা(Opening Journal)

৫.বিপরীত জাবেদা(Reversing Journal)

৬. সংসোধনী জাবেদা(Rectifying Journal)

নিচে সকল প্রকার জাবেদা উদাহরণসহ অলোচনা করা হলো।

ক. বিশেষ জাবেদা।

বিশেষ জাবেদা কাকে বলে?

পুনঃপুন সংগঠিত সমজতীয় লেনদেনসমূহকে আলাদাভাবে যে জাবেদায় লিপিবদ্ধ করা হয় তাকে বিশেষ জাবেদা বলে।

ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে কিছু লেনদেন রয়েছে যা বার বার ঘটে। যেমন : ক্রয়, বিক্রয়, নগদ প্রাপ্তি-প্রদান, এগুলো প্রতিনিয়ত বারবার সংগঠিত হয়। একই লেনেদেন বারবার সাধারণ/ প্রকুত জাবেদায় লিপিবদ্ধ করলে তা দীর্ঘ বা জটিল হয়ে যেতে পারে। তাইে এসকল বিশেষ লেনেদেনকে আলাদা একটি বিশেষ জাবেদায় লিপিবদ্ধ করা হয় । এবং এই বিশেষ জাবেদার ফলাফল নিয়ে খতিয়ান প্রস্তুত করে হিসাব চক্রের বাকি ধাপসমুহ সম্পন্ন করা হয়। যে সকল বিশেষ জাবেদা প্রস্তুত করা হয় তা হলো:-

১.ক্রয় জাবেদা:-

ধারে পণ্য ক্রয় সক্রান্ত লেনদেনসমূহকে যে বইতে লিপিবদ্ধ করা হয় তাকে ক্রয় জাবেদা বলে। শুধুমাত্র মুনাফা অর্জনের জন্য বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ধারে ক্রয় করলেই ক্রয় জাবেদায় লিপিবদ্ধ হবে । নগদে ক্রয় অথবা ব্যবহারের জন্য সম্পত্তি ক্রয় করলে তা ক্রয় জাবেদায় অন্তর্ভুক্ত হবে না। দেখুন :- ক্রয় জাবেদা করার নিয়ম :- নিত্য মজুদ , কালান্তিক মজুদ , একঘরা ও বহু ঘরা ক্রয় জাবেদা

২.বিক্রয় জাবেদা:-

ধারে পণ্য বিক্রয় সক্রান্ত লেনদেনসমূহ যে বইতে লিপিবদ্ধ করা হয় তাকে বিক্রয় জাবেদা বলে। শুধুমাত্র বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত পণ্য ধারে বিক্রয় করা হলে তা বিক্রয় জাবেদায় লিপিবদ্ধ করা হয়। নগদে বিক্রয় বা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি বিক্রয় করলে তা  বিক্রয় জবেদায়  লিপিবদ্ধ হয় না।  বিস্তারিত :- বিক্রয় জাবেদা করার নিয়ম HSC & SSC :- নিত্য ও কালান্তিক মজুদ

৩.ক্রয় ফেরত জাবেদা:-

ধারে বা বকিতে ক্রয়কৃত পণ্য বিক্রেতাকে ফেরত পাঠানো হলে যে জাবেদায় লিপিবদ্ধ করা হয় তাকে ক্রয় ফেরত জাবেদা বলে। ক্রয়কৃত পণ্য ত্রুটিপূর্ণ , নমুনামাফিক না হওয়া , নিম্নমানের হওয়া ইত্যাদি কারণে বিক্রেতাকে ফেরত পাঠানো হয়। বিস্তারিত :- ক্রয় ফেরত বা বহিঃফেরত জাবদা করা নিয়ম ‍HSC & SSC

৪.বিক্রয় ফেরত জাবেদা:-

বাকিতে বা ধারে বিক্রয়কৃত পণ্য ক্রেতার নিকট হতে ফেরত আসলে যে জাবেদায় লিপিবদ্ধ করা হয় তাকে বিক্রয় ফেরত জাবেদা বলে। বিক্রয়কৃত পণ্য ত্রুটিপূর্ণ , নমুনামাফিক না হওয়া , নিম্নমানের হওয়া ইত্যাদি কারণে ক্রেতার নিকট হতে ফেরত আসে।

৫.নগদ প্রদান জাবেদা:-

সকল প্রকার নগদ প্রদানসমূহ যে জাবেদায় লিপিবদ্ধ করা হয় তাকে নগদ প্রদান জাবেদা বলে। উল্লেখ্য চেকে প্রদান করা হলেও তা নগদ প্রদান জাবেদায় নগদ হিসেবে লিাপবদ্ধ হয়।

৬. নগদ প্রাপ্তি জাবেদা:-

সকল প্রকার প্রাপ্তিসমূহ যে জাবেদায় লিখা হয় তাকে নগদ প্রাপ্তি জবেদা বলে। চেকে প্রাপ্তি হলেও নগদ প্রপ্তি জাবেদায় তা নগদ হিসেবে লিপিদ্ধ করা হয়।

৭.নগদান বহি:-

প্রতিষ্ঠানের সকল নগদ ও ব্যাংক সক্রান্ত প্রাপ্তি ও প্রদান যে হিসাবের বহিতে লিপিবদ্ধ করা হয় তাকে নগদান বহি বলে। নগদান বহিও এক প্রকার জাবেদা। এটি করলে নগদ প্রাপ্তি ও নগদ প্রদান জাবেদা করার প্রয়োজন হয় না। নগদান বহিকে সনাতন বা ব্রিটিশ পদ্ধতি এবং নগদ প্রাপ্তি প্রদান জাবেদাকে আধুনিক বা আমেরিকান পদ্ধতি বলা হয়ে থাকে।

এছাড়াও প্রতিষ্ঠানভেদে আরো বিশেষ জাবেদা তৈরী করা হয় । যেমন:-

  • প্রাপ্য বিল জাবেদা।
  • প্রদেয় বিল জবেদা।

খ. প্রকৃত জবেদা

প্রকৃত জবেদা কাকে বলে?

যে সকল লেনদেন বিশেষ জাবেদায় লিপিবদ্ধ করা যায় না , ঐ সকল লেনদেন যে জাবেদায় লিপিবদ্ধ হয় তাকে প্রকৃত জাবেদা বলে।

অর্থ্যাৎ ক্রয়-বিক্রয় , নগদ প্রাপ্তি-প্রদান ছাড়াও ব্যবসায়ে আরো অনেক লেনদেন হয় যা পুনঃপুন বা বারবার হয় না । তাই এসকল লেনদেরের জন্য আলাদা জাবেদা না করে সাধারণ একটি ছকে জাবেদাভুক্ত করা হয়।এগুলোকে প্রকুত জাবেদা বলা হয়। নিচে প্রকুত জাবেদা সমূহ আলোচনা করা হলো:-

১. সাধারণ জাবেদা:-

বিশেষ জাবেদা সংশ্লিষ্ট লেনদেন ব্যতিত অন্য সকল লেনদেন সমূহ সংগঠিত হওয়ার সাথে সাথে হিসাবের যে বহিতে লিপিবদ্ধ করা হয় তাকে সাধারণ জবেদা বলে। ছোট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে  বিশেষ জাবেদা না করে সকল লেনদেন সাধারন জাবেদায় লিপিবদ্ধ করা হয়। 

২.সমন্বয় জাবেদা:-

হিসাবকাল শেষে চুরান্ত হিসাব প্রস্তুত করার পূর্বে হিসাবকালের সকল অসমন্বিত আয় ও ব্যয়সমূহকে নির্ভূল হিসাব প্রস্তুতের লক্ষে সমন্বয়সাধন করে যে জাবেদায় লিপিবদ্ধ করা হয় তাকে সমন্বয় জাবেদা বলে।

যেমন: ১৫ মাসের অগ্রিম ভাড়া  প্রদান করা হলো ১৫,০০০ টাকা ,হিসাবকাল শেষে দেখা গেলো অগ্রিম ভাড়ার ১২ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এখন যদি আর্থিক বিবরনীতে চলতি সম্পদ হিসেবে অগ্রিম ভাড়া ১৫,০০০ টাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয় তবে হিসাব সঠিক হবে না । কারন অগ্রিম  ভাড়ার ১২ মাসের মানে ১২,০০০ টাকার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে । এখন প্রকৃত পক্ষে অগ্রিম ভাড়া ৩,০০০। তাই এই অগ্রিম ভাড়াকে সমন্বয় করতে সমন্বয় দাখিলা প্রদান করা হয়। এরোকম ভাবে সকল অগ্রিম ও বকেয়া আয়-ব্যয় সমন্বয় করা হয়।

৩. সমাপনি জাবেদা:-

যে জাবেদার মাধ্যমে চলতি হিসাব কালের সকল মুনাফাজাতীয় আয়-ব্যয় বন্ধ করা হয় তাকে সমাপনি জাবেদা বলে।

মুনাফাজাতীয় আয়-ব্যয়সমূহ পরবর্তী হিসাবকালে কোন প্রভাব ফেলে না তাই সমাপনি জাবদার মাধ্যমে ঐ হিসাবকালের সকল মুনাফাজাতীয় আয়-ব্যয়কে বন্ধ করে প্রথমে আয়বিবরণী হিসাব এবং তারপর মূলধন হিসাবে স্থানান্তর করা হয়।

৪.প্রারম্ভিক জাবেদা:-

পূর্ববর্তী হিসাবকাল শেষে সম্পদ ও দায়ের যে উদ্বৃত্ত থেকে যায় তা যে জাবেদার মাধ্যমে চলতি হিসাবকালে শুরুতে আনা হয় তাকে প্রারম্ভিক জাবেদা বলে।

উপরে আমরা জানলাম সমাপনি জবেদার মাধ্যমে হিসাবকাল শেষে সকল আয় ও ব্যয় হিসাব বন্ধ করা হয় । আর সকল আয়-ব্যয় বন্ধ হলে বাকি থেকে যায় সম্পদ ও দায় হিসাব । প্রারম্ভিব জাবেদার মাধ্যমেই পূর্ববর্তী হিসাবকালের সম্পদ ও দায়সমূহ বর্তমান হিসাবকালে আনা হয়। সকল সম্পদকে ডেবিট এবং সকল দায়কে ক্রেডিট করা হয়।

৫.বিপরীত দাখিলা:-

একটি হিসাবকালের আগ্রিম ও বকেয়া আয়-ব্যয়ের জন্য যে সমন্বয় জাবেদা করা হয় পরবর্তী হিসাবকালের শুরুতে তার উল্টো দাখিলা দিয়ে যে জাবেদ প্রস্তুত করা হয় তাকে বিপরীত দাখিলা বলে।

এটি একটি ঐছিক জাবেদা । সকল প্রতিষ্ঠান এটি প্রস্তুত করে না। তাছাড়াও সকল সমন্বয় জাবেদার বিবপরীত জাবেদা হয় না। তবে নিভূল হিসাবরক্ষনে এটি গুরুত্বপূর্ণ  ভুমিকা পালন করে।

৬.সংশোধনী জাবেদা:-

কোন হিসাবকালে জাবেদার মাধ্যমে লেনদেন লিপিবদ্ধ করার সময় যদি কোন ভুল হয়, কিছু বাদ পরে যায়  বা কমবেশী লিখা হয় তবে তা সংশোধনের লক্ষে যে জাবদা দাখিলা দেহয়া হয় তাকে সংশোধনী জাবেদা বলে।

হিসাববিজ্ঞানের নিয়ম অনুজায়ী জাবেদায় ভুল হলে তা ঠিক করার জন্য কাটাছিরা বা ঘসামাজা করা যায় না। তাই ভুল সংশোধনের জন্য সংশোধনী জাবদো দাখিলা দেওয়া হয়।

এন্ট্রি বা দাখিলার ভিত্তিতে জাবেদা

১.সরল জাবেদা:-

যে জাবেদায় শুধুমাত্র একটি ডেবিট এবং একটি ক্রেডিট হিসাব থাকে তাকে সরল জাবেদা বলে। যেমন:

👉নগদ বিক্রয় ৪০০ টাকা।

নগদান হিসাব ডেবিট—৪০০

বিক্রয় হিসাব ক্রেডিট—৪০০

এখানে একটি ডেবিট এবং একটি ক্রেডিট তাই এটি সরল জাবেদা।

২.জটিল ,জৌগিক বা মিশ্র জাবেদা:-

যে জাবেদায় দুই বা ততধিক ডেবিট বা ক্রেডিট হিসাব থাকে তাকে মিশ্র জাবেদা বলে।যেমন:

👉 বিক্রয় ৪০০০ টাকা যার ৫০% নগদে ৫০% বাকিতে।

নগদান হিসাব ডেবিট—২০০০

প্রাপ্য হিসাব ডেবিট—২০০০

বিক্রয় হিসাব ক্রেডিট—৪০০০

এখানে দুটি ডেবিট বয়েছে   তাই এটি জৌগিক বা মিশ্র জাবেদা। 

Leave a Reply